রাজবাড়ি ঢোকার মুখেই বিশাল একটা পুকুর। তার শান বাঁধানো ঘাটে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। ছায়া-সুশীতল ঘাট, নিস্তরঙ্গ জল। তার পাশেই শিবমন্দির।কম করে হলেও ৩০০ বছরের পুরনো। তার সাথেও বড় পুকুর। চারিদিকে গাছপালায় ঢাকা, ছায়া ছায়া। মন্দিরের ভেতরে গমগম করছে জটাধারী সন্ন্যাসীর গলা, লাল বস্ত্র, তিলক কপালে, মন্ত্র আউড়ে যাচ্ছেন।
[প্রথম পুকুর]
[শিব মন্দির]
মন্দিরের পাশের রাস্তা ধরে হেঁটে গেলে সামনে পরে কাচারী বাড়ি। এখন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। চারিদিকে অযত্নের ছাপ। কোন রক্ষনাবেক্ষণ নেই বোঝাই যাচ্ছে। এই রাজবাড়ি রানীর মৃত্যুর পরে তার দুই ছেলের মাঝে ভাগ করে দেয়া হয়। একপাশে বড় ছেলের জমিদারি অন্যপাশে ছোট ছেলের। বাড়িগুলো জায়গায় জায়গায় ভেঙ্গে গেছে। টিকিয়ে রাখার কোন চেষ্টাই করা হয়নি। অনেকগুলো বাড়ি পুরোপুরি ধ্বসে গেছে। এখানেও দেয়ালে নানা ধরনের লেখা। বোঝাই যাচ্ছে অতি উৎসাহীদের কাজ। বাড়িটি ঘিরে বড় বড় পাঁচটি পুকুর, অসংখ্য গাছ। কোনমতে টিকে থাকা বিশাল দালানগুলোতে প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে আছে দারুন সব কাজ। কোনায় কোনায় যুগলদের ফিসফাস, হঠাৎ সামনে পড়ে যাওয়ায় বিব্রত আমরা।
[কাচারী বাড়ি]
[কাচারী বাড়ির বারান্দা থেকে সামনের পুকুর]
[লোহার সিড়ির ভগ্নদশা]
[কিছু মর্কটের ভালোবাসার আহ্ববান]
[ভেঙ্গে পড়া বাড়ির একাংশ]
[পুরাতন কুয়ো]
[ছোট জমিদারের দালানের একাংশ]
[দালানের পেছনের ঝর্না]
রাজবাড়ির ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত রানী ভবানীর মহলটি। পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। মাটিতে অনেকটা দেবে গেছে প্রায় পুরো জায়গাটি। ভাঙ্গা দেয়ালে বাসিন্দাদের জামা কাপড় শুকোতে দেয়া হয়েছে। হাঁস-মুরগি আর ছাগল চড়ে বেরাচ্ছে এদিক সেদিক। বিন্দুমাত্র রক্ষনাবেক্ষণ নেই। বড় জমিদারের দালানটি এখনও টিকে আছে সব থেকে ভালো অবস্থায়। তাই বাইরে থেকে ঘুরে ঘুরে দেখলাম আর আফসোস করলাম। দরজার কপাটের ফাঁক দিয়ে ভেতরের ছবি তোলার চেষ্টা করলাম। প্রবেশাধিকার নেই তাই ভেতরটা এখনও টিকে আছে দেখে ভালো লাগলো। সামনের মাঠে স্থানীয়দের ক্রিকেট খেলার জায়গা। যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে রাজবাড়িটি। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো কোন প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা এভাবে অরক্ষিতভাবে ব্যবহার করা হয় বলে আমাদের জানা ছিলোনা।
[রানীর মহলের অবস্থা]
[বড় জমিদারের মহলের ভেতরে, কপাটের ফাঁক দিয়ে তোলা]
[বড় জমিদারের মহল সামনের রাস্তা থেকে, মাঠে স্থানীয়রা ক্রিকেট খেলছে]
মাত্র ৮০ টাকায় ঠিক করা হলো একটা ছিপ নৌকা। মাঝি বয়সে তরুণ, হাসিখুশি দারুন ব্যবহার। ঘুরে ঘুরে দেখাতে লাগলো বিলের এদিক সেদিক। প্রচন্ড রোদে প্রথমে একটু অস্বস্তি লাগলেও পরে ধীরে ধীরে আত্মস্থ হয়ে উঠলো পরিবেশ। চারিদিকে জল তার মাঝে মাঝে একটা দুটো গ্রাম। নৌকাই এখানের প্রধান বাহন। চারিদিকে ধান লাগানো হয়েছে। মাঝি জানালো সব বাড়িতেই বিদ্যুৎ এর সংযোগ আছে, আছে ক্যাবল টিভির সংযোগ। হাসিমুখে জানালেন ঢাকা শহরে কাজ করেছিলেন ৭ বছর, তার থেকে অনেক ভালো আছেন এখন নিজের গ্রামে।
[নৌকা থেকে]
[বিলের অগভীর জায়গায় শস্যের ক্ষেত্]
[বিলের মাঝখানে একটুকরো চর]
[নৌকার মাঝি]
[পেতে রাখা মাছ ধরার জাল]
প্রচুর মাছ ধরা হয় এখানে। মৌসুমে ৭০-৮০ মন মাছ উঠে এক এক নৌকায়। এখন ধান চাষ করা হচ্ছে। আর কদিন পরেই জল এসে উচ্চতা বেড়ে গেলে জেগে উঠা ছোট ছোট চর ঢেকে যাবে। বিভিন্ন জায়গায় মাছ ধরার জাল লাগিয়ে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে আমাদের নৌকার দিকে উৎসুক মানুষের দৃষ্টি। একটা ছোট চরে নেমে পড়লাম অল্প কিছুক্ষণের জন্য। জায়গাটা দারুন সুন্দর। চারপাশে জল তার মাঝখানে একটুখানি মাটি। প্রায় ঘন্টা দেড়েক ঘুরে বেড়ানো হলো নৌকায় আর মাঝির সাথে চললো নানা বিষয়ে গল্প। মাঝির একটাই কথা, শহরের মানুষ যে দূষণে থাকে তার থেকে তারা অনেক ভালো আছেন, শান্তিতে আছেন। দুপুরে তাদের বাড়িতে খাওয়ার জন্যও বললেন কয়েকবার। বিল দেখা শেষ করে এবার আবার ফিরে নাটোর শহরে।
Collected by শুধু বাঙলা
No comments:
Post a Comment